রাজনীতি

গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের প্রশ্নে তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন ও আগামীর রাজনীতি

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একটি প্রকৃত, সুসংহত গণতন্ত্র এ দেশের আপামর জনগণের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন।

স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের প্রশ্নটি আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একটি প্রকৃত, সুসংহত গণতন্ত্র এ দেশের আপামর জনগণের দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন। বর্তমানে সেই স্বপ্ন পূরণের কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে উঠে এসেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। দীর্ঘ ১৭ বছর নির্বাসনের পর ২৫ ডিসেম্বর তিনি দেশে ফিরেছেন। এ ঘটনা রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। এ প্রত্যাবর্তন বাংলাদেশের রাজনীতির অভ্যন্তরীণ কাঠামো, গণতান্ত্রিক ধারার পুনর্গঠন ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রশ্নকে নতুনভাবে দাঁড় করিয়েছে। তারেক রহমানের এ প্রত্যাবর্তন কেবল একটি দলীয় নেতার স্বদেশে ফেরা নয়; বরং এটি একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার পুনরুজ্জীবনের সূচনা হিসেবে দেখা যায়। যদিও বিএনপির ভেতরে এ প্রত্যাবর্তনকে ‘ঐতিহাসিক’ হিসেবে মূল্যায়ন করা হচ্ছে, তবে বাস্তবে রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটটি অনেক বেশি বহুমাত্রিক ও তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ তারেক রহমানের মাধ্যমে জনগণ সেই বহুদিনের প্রত্যাশিত গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের স্বপ্ন আবারো দেখতে শুরু করেছে।

তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তন নতুন জনমনে স্বস্তি ও আশাবাদের সঞ্চার করেছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে তার দেশে ফেরা ঘিরে ঢাকায় যে জনজোয়ার সৃষ্টি হয়, তা ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রিয় নেতাকে সংবর্ধনা জানাতে দেশের প্রায় প্রতিটি ইউনিট থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা ঢাকায় জড়ো হন। কারো হাতে ছিল বাংলাদেশের পতাকা, দলের পতাকা ও প্লাকার্ড, কেউ পরেছিলেন দলের লোগোসংবলিত ব্যাজ। নানা রঙের ব্যানার, প্লাকার্ড ও ফুল হাতে নিয়ে নেতাকর্মীরা সড়কের দুই পাশে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে পড়েন। হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে পূর্বাচলের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ের সংবর্ধনা মঞ্চ পর্যন্ত পুরো পথে ধ্বনিত হতে থাকে ‘তারেক রহমানের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম’, ‘বাংলাদেশের প্রাণ, তারেক রহমান’ এমন অসংখ্য স্লোগান। স্লোগানে উঠে আসে দীর্ঘদিনের অপেক্ষা, প্রত্যাশা ও আবেগের সম্মিলিত প্রতিফলন। বিমানবন্দর থেকে বের হয়েই তারেক রহমান খালি পায়ে শিশিরভেজা ঘাসে দাঁড়িয়ে ১৭ বছর পর দেশের মাটিতে প্রথম স্পর্শ নেন। এ মুহূর্তটি যেন দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি তার গভীর ভালোবাসা, মমত্ববোধ ও আত্মিক সংযোগেরই বহিঃপ্রকাশ। এটি ছিল বহু মানুষের চোখে এক প্রত্যাশিত নেতার ঘরে ফেরা, যিনি মাটি ও মানুষের প্রতিনিধি হিসেবে নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষার প্রতীক হয়ে উঠেছেন।

দেশে ফিরেই তারেক রহমান উন্নত নিরাপত্তাসম্পন্ন বুলেটপ্রুফ গাড়ি উপেক্ষা করে উঠে বসেন লাল-সবুজ রঙের একটি বাসে। বাসের সামনের সিটে বসে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা দলীয় নেতাকর্মীদের সঙ্গে হাসিমুখে শুভেচ্ছা বিনিময় করেন। হাত নাড়িয়ে জানান দেন দেশবাসীকে তার উপস্থিতির বার্তা। পরবর্তী সময়ে তিনি পূর্বাচলের জুলাই ৩৬ এক্সপ্রেসওয়ের সংবর্ধনা মঞ্চে ওঠেন। সেখানেও তিনি রাজকীয় চেয়ার পরিহার করে বসেন একটি সাধারণ চেয়ারে। এমন সাদাসিধা আচরণ যেন তার রাজনৈতিক দর্শনেরই প্রতিফলন, যেখানে স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠেছে তার ক্ষমতার জাঁকজমক নয়, বরং সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার আকাঙ্ক্ষা।

এরপর নেতাকর্মী ও দেশবাসীর উদ্দেশে রাখলেন ১৭ মিনিটের বক্তব্য। এ বক্তব্যে তারেক রহমান কেবল রাজনৈতিক আশ্বাস দেননি বরং তিনি একটি দিশা দেখানোর চেষ্টা করেছেন। তার কথায় দেশবাসী নতুন করে স্বপ্ন দেখতে শুরু করেছে। দীর্ঘদিনের অস্থিরতা, অনিশ্চয়তা ও বিভক্তির পর তার বক্তব্য যেন শান্তির এক অমিয় বাণী। স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে তিনি এমন একটি নিরাপদ বাংলাদেশের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন, যেখানে নারী-পুরুষ, শিশু এমনকি সব ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ সমানভাবে নিরাপদে বসবাস করতে পারবে। এ অঙ্গীকার একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষাকে সামনে নিয়ে আসার প্রয়াস হিসেবেই জনমনে প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

বলা বাহুল্য, যেই রাষ্ট্রনায়ককে মানুষ প্রত্যাশা করে, তার বক্তব্য ও আচরণে যেন সেই প্রতিচ্ছবিই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অনেকের চোখে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের আদর্শ ও নেতৃত্বের এক ছায়া যেন তারেক রহমানের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। দেশকে বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের করে এনে ঐক্যের বন্ধনে আবদ্ধ করার ব্যাপারে তিনি দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করেছে। ভবিষ্যতে যারা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে আসবেন, তাদেরকে ন্যায়পরায়ণতা ও নৈতিকতার আলোকে দেশ পরিচালনা করতে হবে বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার বক্তব্যের মধ্যে নৈতিক রাষ্ট্রচিন্তার এ আহ্বান জনমনে বিশেষভাবে দাগ কেটেছে। তবে সবচেয়ে আকর্ষণীয় দিক ছিল মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের ঐতিহাসিক ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’-এর অনুরণনে তারেক রহমানের উচ্চারণ ‘আই হ্যাভ এ প্ল্যান ফর দ্য পিপল অব মাই কান্ট্রি’। এ বক্তব্যের মধ্য দিয়ে তিনি কেবল স্বপ্ন নয়, বরং রাষ্ট্র গঠনের একটি সুস্পষ্ট দিশা দেয়ার চেষ্টা করেছেন।

তিনি স্পষ্ট ভাষায় সব প্রকার উসকানি উপেক্ষা করে ঐক্যবদ্ধভাবে দেশকে শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তির ওপর গড়ে তোলার আহ্বান জানান। সম্মিলিত প্রচেষ্টায় একটি প্রত্যাশিত বাংলাদেশ নির্মাণের দৃঢ় অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন এবং দেশের মানুষের কল্যাণে তার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সবার সহযোগিতা কামনা করেন। এর আগেও বিভিন্ন বক্তব্যে তারেক রহমান রাষ্ট্র পরিচালনায় তার সুস্পষ্ট পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেছেন। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও কর্মসংস্থান খাতে মৌলিক ও কাঠামোগত সংস্কারের ওপর তিনি সর্বোচ্চ গুরুত্বারোপ করতে চান। টেকসই রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে এসব খাতকে আলাদাভাবে নয়, বরং সমন্বিতভাবে সংস্কারের ওপর তিনি জোর দিয়েছেন, যা তার রাজনৈতিক চিন্তার একটি সুসংহত রূপরেখাই নির্দেশ করে।

বলতে গেলে, দীর্ঘ দেড় দশকের স্বৈরাচারী শাসনামল, জুলাই আন্দোলন-পরবর্তী রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং ধারাবাহিক অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের রাজনীতি আজ একটি দ্রুত পরিবর্তনশীল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক স্থবিরতা ও ক্ষমতার একমুখী প্রবাহের পর সাম্প্রতিক সময়ে দেশে যে পুনর্গঠনের আভাস মিলছে, তা নিঃসন্দেহে একটি গভীর রূপান্তরের ইঙ্গিত বহন করে। ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর গঠিত অন্তর্বর্তী সরকার সেই পুনর্গঠন প্রক্রিয়াকে আরো গতিশীল ও দৃশ্যমান করে তুলেছে। রাজনীতির ময়দানে দীর্ঘদিন অনুপস্থিত এক প্রধান রাজনৈতিক চরিত্রের ফিরে আসা স্বাভাবিকভাবেই শক্তির ভারসাম্য, রাজনৈতিক ভাষ্য এবং আগামীর ক্ষমতার সমীকরণে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।

তাই বর্তমান পরিবর্তিত প্রেক্ষাপটে আবারো তারেক রহমানের প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে গণতান্ত্রিক ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রের ধারণা নতুনভাবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে এসেছে। তার বক্তব্যে সব সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা, শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান এবং গণতান্ত্রিক ও অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী করার যে অঙ্গীকার প্রকাশ পেয়েছে, তা মূলত রাষ্ট্রচিন্তার একটি বিস্তৃত কাঠামোকে নির্দেশ করে। গণতন্ত্রকে কেবল নির্বাচনী প্রক্রিয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে, নাগরিক অধিকার, রাষ্ট্রীয় জবাবদিহি এবং ন্যায়বিচার ব্যবস্থার কার্যকর বাস্তবায়নের সঙ্গে যুক্ত করার স্পষ্ট প্রয়াস লক্ষ করা যায়। এ বক্তব্য রাজনৈতিক পরিসরে একটি মৌলিক প্রশ্নও উত্থাপন করে, রাষ্ট্র কি কেবল ক্ষমতার কাঠামো টিকিয়ে রাখার যন্ত্র হিসেবে থাকবে, নাকি নাগরিক মর্যাদা ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার একটি নৈতিক ব্যবস্থায় রূপ নেবে? এ প্রশ্নের পাশাপাশি আরো গভীর একটি দ্বন্দ্বও সামনে আসে। তা হলো রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কি আগের মতোই সংঘাতমুখী থাকবে, নাকি গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার দিকে অগ্রসর হবে? ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্রের ধারণা কখনই সম্পূর্ণ প্রশ্নহীন বা অবিকল স্বচ্ছ ছিল না।

ফলে এখন সবচেয়ে জোরালোভাবে যে প্রশ্নটি সামনে আসে, তা হলো গণতন্ত্র কি শুধু ভোটের দিনে সক্রিয় থাকবে, নাকি তা রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রতিটি স্তরে ন্যায়বিচার, জবাবদিহি ও নাগরিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করবে? এ নিয়ে পক্ষে-বিপক্ষে নানা মত থাকা স্বাভাবিক। তবে তারেক রহমানের দৃঢ়তা ও সুস্পষ্ট বার্তার কারণে আগামীর রাজনীতি স্বাভাবিকভাবেই বিএনপির দিকে ঝুঁকবে বলে মত বিশ্লেষকদের। যদি তারেক রহমানের ‘পরিকল্পনা’ পূর্ণতার দিকে এগোয়, তাহলে বাংলাদেশের গণতন্ত্র হতে পারে সুসংহত এবং রাষ্ট্র হতে পারে ন্যায়ভিত্তিক। আর এজন্য জাতীয়তাবাদী শক্তিকে একত্র হয়ে তারেক রহমানের হাতকে শক্তিশালী করতে সচেষ্ট থাকতে হবে। পাশাপাশি সবাইকে একযোগে কাজ করতে হবে এবং ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে।

ড. মো. শামছুল আলম: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক এবং সমাজবিজ্ঞান অনুষদের ভারপ্রাপ্ত ডিন

আরও